গল্প: ঘরবন্দি তৈয়ব
২১ বছরের তৈয়ব। নামটা শুনলেই সবাই ভাবে—চঞ্চল, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এক তরুণ। কিন্তু বাস্তবটা একদম উল্টো। তৈয়বের জীবনটা যেন চার দেয়ালের ভেতরে থেমে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে, মায়ের ডাকে নাশতা খেয়ে, দুপুরে একটু বই পড়ে, বিকেলে ছাদের রেলিং ধরে আকাশ দেখে—এটাই তার প্রতিদিনের রুটিন।
তৈয়ব এখনো বেকার। পড়াশোনা শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে, কিন্তু চাকরির কোনো খবরই এখনো মেলেনি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল তার—নিজের টাকায় বাবা-মাকে কিছু কিনে দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, কিংবা একা একা কোনো পাহাড়ি জায়গায় গিয়ে সূর্যাস্ত দেখা। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো এখন বুকের ভেতরেই বন্দি।
বাবা-মা তাকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার গায়ে আছে ভয় আর চিন্তার মোড়ক।
তারা কখনো তৈয়বকে একা কোথাও যেতে দেন না।
“এই সময়ে রাস্তাঘাটে কত কিছু হচ্ছে, যদি কিছু হয়ে যায়?”—মায়ের কণ্ঠে আতঙ্ক।
“তুই এখনো কিছু উপার্জন করিস না, দায়িত্ব নিতে পারবি না”—বাবার গলায় কঠিন বাস্তবতা।
তৈয়ব এসব শুনে চুপ করে যায়। তর্ক করার মতো শক্তিটুকুও আর নেই। কিন্তু মনটা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়।
বন্ধুরা মাঝে মাঝে ফোন দেয়—
“এই তৈয়ব, আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি রে! তোকে খুব মিস করব।”
তৈয়ব শুধু হেসে বলে, “আচ্ছা, অনেক ছবি তুলে পাঠিও।”
রাতের নিস্তব্ধতায় ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তৈয়ব আকাশের তারা গোনে। তার মনে হয়, এই তারাগুলোও যেন মুক্ত, কিন্তু সে নয়।
তার ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে যায়—অর্থহীনতা, একাকিত্ব আর অবুঝ ভালোবাসার বাঁধনে জড়ানো জীবনের ভারে।
একদিন, সে নিজের পুরোনো নোটবুকে লিখে রাখে—
“আমি হয়তো আজ ঘরবন্দি, কিন্তু একদিন আমি উড়ব।
নিজের মতো করে, নিজের আকাশে।”
সেই দিনটা এখনো আসেনি। কিন্তু তৈয়ব জানে—যে স্বপ্ন এখন বুকের ভেতরে বন্দি, একদিন সেই স্বপ্নই তাকে দরজা পেরিয়ে নিয়ে যাবে নিজের জীবনের পথে।

Comments
Post a Comment